ঢাকা ০১:২৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ২০ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা

গ্রাফিক্স: দ্য বেঙ্গল

ঢাকা: বাংলাদেশের রাজনীতিতে ৫ আগস্ট ২০২৪ এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় নেয়, যা কেবল দেশীয় প্রেক্ষাপটেই নয়, আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের চাপে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারত আশ্রয় নেন।

দীর্ঘদিনের একদলীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে জনরোষের বিস্ফোরণ ঘটে, যা শেষ পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক কাঠামোতেই বিরাট পরিবর্তন নিয়ে আসে। এই পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়, যা বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং নতুন পথচলার সূচনা করেছে।

নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রথমেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন ব্যবস্থায় ব্যাপক কারচুপি, ভোট ডাকাতি এবং প্রশাসনের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ছিল।

২০১৪ এবং ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক আস্থার সংকট তৈরি করেছিল। ফলে, নতুন সরকার নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়, যেখানে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার জন্য কঠোর বিধি প্রণয়ন করা হয়।

এরপর প্রশাসনের দলীয়করণ রোধে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সরিয়ে পেশাদার ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করা হয়, যা আগের সরকারের সময় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হওয়া মামলাগুলো পর্যালোচনা করতে শুরু করে। এই উদ্যোগ দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আশা জাগিয়েছে।

এই পরিবর্তনের পর দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুনভাবে গড়ে তোলা হয়। শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিল, যা অনেক সময় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নও তুলেছিল।

নতুন সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা শুরু করে এবং চীনের সঙ্গে নতুন অর্থনৈতিক আলোচনা করে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যারা আগের সরকারের অধীনে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অবনতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল, তারা নতুন সরকারের প্রতি সমর্থন দেখাতে শুরু করে।

তবে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় চ্যালেঞ্জও কম নয়। শেখ হাসিনার ক্ষমতা ছাড়ার পর তার দল, আওয়ামী লীগ, পুনর্গঠনের চেষ্টা চালাচ্ছে এবং নতুন সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে চাইছে।

দলটির অভ্যন্তরে বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—একাংশ নতুন নেতৃত্ব চায়, অন্য অংশ শেখ হাসিনার অনুগত থেকে তার প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন দেখছে। বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দলও নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। ফলে, রাজনৈতিক অস্থিরতার শঙ্কা এখনো রয়ে গেছে।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও নতুন সরকার বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। আগের সরকারের সময় দুর্নীতির কারণে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বেড়ে গিয়েছিল, যা অর্থনীতির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করেছে।

নতুন সরকার দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু করেছে এবং কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে তদন্ত চালাচ্ছে। তবে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে হলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে।

সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক। দীর্ঘদিন ধরে দমন-পীড়ন, বাকস্বাধীনতার সংকোচন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হওয়া জনগণ এখন একটি নতুন বাংলাদেশ দেখতে চায়। স্বাধীন মিডিয়া, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার নিশ্চিত করা নতুন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা।

বিশ্বরাজনীতির দিকে তাকালে দেখা যায়, যখনই কোনো দেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন আসে, তখন সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে অনেক সময় তা ব্যর্থ হয়। বাংলাদেশ এই ক্রান্তিকাল অতিক্রম করে কি গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যেতে পারবে? নাকি রাজনৈতিক বিভেদ, প্রতিহিংসা এবং অস্থিরতা নতুন করে সংকট সৃষ্টি করবে?

ইতিহাস বলে, গণতন্ত্র তখনই শক্তিশালী হয় যখন জনগণ তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকে এবং সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে। বাংলাদেশের জনগণ বারবার আন্দোলনের মাধ্যমে পরিবর্তন এনেছে। ৫ আগস্টের পরের বাংলাদেশ কি সত্যিই একটি নতুন সূচনা করতে পারবে? সেই উত্তর সময়ই দেবে।

লেখক: শিক্ষাবিদ ও সংগঠক

জনপ্রিয়

রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য হলেন সাইদুল ইসলাম

৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা

আপডেট: ০৪:৫১:১৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৫

ঢাকা: বাংলাদেশের রাজনীতিতে ৫ আগস্ট ২০২৪ এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় নেয়, যা কেবল দেশীয় প্রেক্ষাপটেই নয়, আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের চাপে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারত আশ্রয় নেন।

দীর্ঘদিনের একদলীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে জনরোষের বিস্ফোরণ ঘটে, যা শেষ পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক কাঠামোতেই বিরাট পরিবর্তন নিয়ে আসে। এই পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়, যা বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং নতুন পথচলার সূচনা করেছে।

নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রথমেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন ব্যবস্থায় ব্যাপক কারচুপি, ভোট ডাকাতি এবং প্রশাসনের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ছিল।

২০১৪ এবং ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক আস্থার সংকট তৈরি করেছিল। ফলে, নতুন সরকার নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়, যেখানে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার জন্য কঠোর বিধি প্রণয়ন করা হয়।

এরপর প্রশাসনের দলীয়করণ রোধে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সরিয়ে পেশাদার ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করা হয়, যা আগের সরকারের সময় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হওয়া মামলাগুলো পর্যালোচনা করতে শুরু করে। এই উদ্যোগ দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আশা জাগিয়েছে।

এই পরিবর্তনের পর দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুনভাবে গড়ে তোলা হয়। শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিল, যা অনেক সময় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নও তুলেছিল।

নতুন সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা শুরু করে এবং চীনের সঙ্গে নতুন অর্থনৈতিক আলোচনা করে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যারা আগের সরকারের অধীনে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অবনতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল, তারা নতুন সরকারের প্রতি সমর্থন দেখাতে শুরু করে।

তবে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় চ্যালেঞ্জও কম নয়। শেখ হাসিনার ক্ষমতা ছাড়ার পর তার দল, আওয়ামী লীগ, পুনর্গঠনের চেষ্টা চালাচ্ছে এবং নতুন সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে চাইছে।

দলটির অভ্যন্তরে বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—একাংশ নতুন নেতৃত্ব চায়, অন্য অংশ শেখ হাসিনার অনুগত থেকে তার প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন দেখছে। বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দলও নিজেদের অবস্থান পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। ফলে, রাজনৈতিক অস্থিরতার শঙ্কা এখনো রয়ে গেছে।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও নতুন সরকার বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। আগের সরকারের সময় দুর্নীতির কারণে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বেড়ে গিয়েছিল, যা অর্থনীতির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করেছে।

নতুন সরকার দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু করেছে এবং কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে তদন্ত চালাচ্ছে। তবে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে হলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে।

সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক। দীর্ঘদিন ধরে দমন-পীড়ন, বাকস্বাধীনতার সংকোচন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হওয়া জনগণ এখন একটি নতুন বাংলাদেশ দেখতে চায়। স্বাধীন মিডিয়া, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার নিশ্চিত করা নতুন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা।

বিশ্বরাজনীতির দিকে তাকালে দেখা যায়, যখনই কোনো দেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন আসে, তখন সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে অনেক সময় তা ব্যর্থ হয়। বাংলাদেশ এই ক্রান্তিকাল অতিক্রম করে কি গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যেতে পারবে? নাকি রাজনৈতিক বিভেদ, প্রতিহিংসা এবং অস্থিরতা নতুন করে সংকট সৃষ্টি করবে?

ইতিহাস বলে, গণতন্ত্র তখনই শক্তিশালী হয় যখন জনগণ তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকে এবং সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে। বাংলাদেশের জনগণ বারবার আন্দোলনের মাধ্যমে পরিবর্তন এনেছে। ৫ আগস্টের পরের বাংলাদেশ কি সত্যিই একটি নতুন সূচনা করতে পারবে? সেই উত্তর সময়ই দেবে।

লেখক: শিক্ষাবিদ ও সংগঠক