ঢাকা: ফেনী বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা। এর ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং শিক্ষার প্রতি স্থানীয় জনগণের আগ্রহ বরাবরই লক্ষণীয়।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই জেলায় এখনো কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বা সরকারি মেডিকেল কলেজ নেই। উচ্চশিক্ষার জন্য এখানকার শিক্ষার্থীদের চট্টগ্রাম, কুমিল্লা বা ঢাকার মতো দূরবর্তী শহরে যেতে হয়। একইভাবে, উন্নত চিকিৎসার জন্য রোগীদেরও চট্টগ্রাম, ঢাকা কিংবা কুমিল্লার হাসপাতালমুখী হতে হয়, যা সময় ও অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তিও বয়ে আনে।
বর্তমানে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার প্রসার ঘটছে, তবে তা এখনো সুষমভাবে বণ্টিত হয়নি। বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত ঢাকা ও কিছু বড় শহরকেন্দ্রিক। ফলে জেলা পর্যায়ে মেধাবী শিক্ষার্থীরা সমান সুযোগ পায় না। ফেনীতে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে এই অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা নিজ এলাকায় থেকেই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাবে। এতে শুধু শিক্ষার্থীরা নয়, তাদের পরিবারগুলোরও অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপ কমবে।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেবল শিক্ষার কেন্দ্র নয়, এটি গবেষণা, উদ্ভাবন এবং স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশেও ভূমিকা রাখে। ফেনী জেলা কৃষি, শিল্প, ও ব্যবসার জন্য সম্ভাবনাময়। যদি এখানে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়, তাহলে সেটি কৃষি গবেষণা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং প্রযুক্তির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ফেনীর কৃষি খাত নিয়ে গবেষণা করলে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির প্রয়োগ বৃদ্ধি পাবে, যা কৃষকদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়তা করবে।
অন্যদিকে, ফেনীতে সরকারি মেডিকেল কলেজ স্থাপনও অত্যন্ত জরুরি। এখানকার হাসপাতালগুলোর সীমিত সুবিধার কারণে জটিল রোগের চিকিৎসা নিতে মানুষকে চট্টগ্রাম বা ঢাকায় যেতে হয়। এতে অনেক সময় রোগীর প্রাণহানির আশঙ্কাও তৈরি হয়। একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে চিকিৎসা খাতে ব্যাপক উন্নয়ন আসবে এবং ফেনীর সাধারণ মানুষ উন্নত চিকিৎসাসেবা পাবেন।
বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন জেলায় নতুন মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। ফেনী এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত, কারণ এটি ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি জেলা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সংযোগস্থলে থাকায় এটি একটি অর্থনৈতিক কেন্দ্রও বটে। ফলে এখানে সরকারি মেডিকেল কলেজ স্থাপন করলে আশপাশের জেলার মানুষও উপকৃত হবে।
সরকারি মেডিকেল কলেজ শুধু চিকিৎসা শিক্ষার প্রসার ঘটায় না, এটি দক্ষ চিকিৎসক তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী চিকিৎসক হতে চাইলেও আসনসংখ্যার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী সুযোগ পান না। ফেনীতে একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হলে এখানে নতুন চিকিৎসক তৈরি হবে, যা দেশের স্বাস্থ্যখাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এছাড়া, উচ্চশিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা উন্নত হলে একটি অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়ন ঘটে। ফেনীতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে এখানে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। শিক্ষক, গবেষক, চিকিৎসক, নার্স, প্রশাসনিক কর্মকর্তা থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের জন্য নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হবে। স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যও সম্প্রসারিত হবে, যা অর্থনীতির চাকা আরও গতিশীল করবে।
প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এখনো ফেনীতে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হয়নি? এর পেছনে প্রশাসনিক জটিলতা, রাজনৈতিক অগ্রাধিকার এবং কেন্দ্রীয় বাজেট বণ্টনের বিষয়গুলো কাজ করতে পারে। তবে এখন সময় এসেছে, ফেনীর জনগণ, জনপ্রতিনিধি ও শিক্ষাবিদদের এ বিষয়ে সোচ্চার হওয়ার। সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে এ দাবি উপস্থাপন করতে হবে এবং দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য চাপ সৃষ্টি করতে হবে।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজ শুধু শিক্ষার ক্ষেত্রেই নয়, সামগ্রিকভাবে একটি অঞ্চলের জীবনযাত্রার মান উন্নত করে। এটি ফেনীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি হতে পারে। তাই সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত এ বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
ফেনী একটি সম্ভাবনাময় জেলা, যা শিক্ষার আলোতে আরও বিকশিত হতে পারে। এখানে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি মেডিকেল কলেজ স্থাপন সময়ের দাবি, যা কেবল ফেনী নয়, গোটা বাংলাদেশের উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে। এখন দেখার বিষয়, সরকার এ ব্যাপারে কতটা উদ্যোগী হয় এবং কত দ্রুত এই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়।
লেখক: শিক্ষাবিদ ও সংগঠক