ঢাকা: ২ ফেব্রুয়ারী বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির প্রথম শহীদ নজির আহমদের ৮২ তম শাহাদাত বার্ষিকী। ফেনীর এই কৃতি সন্তান ১৯৪৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শাহাদাত বরণ করেন। ইংরেজদের থেকে স্বাধীনতা আদায়ের এক অগ্রগণ্য সেনাপতি ছিলেন ফেনীর নাজির আহমদ। তিনি ছিলেন তৎকালীন মুসলিম লীগের ছাত্রসংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্ট লীগের নেতা।
১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে লম্বা সময় পর্যন্ত ছাত্র কিংবা শিক্ষকদের মধ্যে রাজনীতির তেমন প্রভাব না থাকলেও, লাহোর প্রস্তাবের পর হিন্দু ও মুসলমানের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে গেলো—হিন্দুরা কংগ্রেসের অধীনে অখণ্ড ভারত এবং মুসলমানরা মুসলিম লীগের অধীনে পাকিস্তানের দাবিতে সোচ্চার হতে শুরু করে।
এই দাবি ও রাজনীতির প্রভাব সরাসরি বিস্তার লাভ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষকদের মধ্যে। সাংগঠনিক কিংবা কাঠামোগত রাজনীতি তখনও প্রবেশ না করলেও, সম্প্রদায়গত অসাংগঠনিক রাজনীতির উত্থান ঘটে গেছে চল্লিশের পরেই।
এভাবেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ইতিহাসের সূচনা হয়। এই সূচনাবিন্দুতেই সংঘটিত হয় নজির হত্যাকান্ডের মত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা, যা সদ্য প্রবেশিত অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে স্থায়ী রূপদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
১৯৪৩ সালের জানুয়ারির শেষদিকে মুসলিম ও হিন্দু ছাত্রীদের একটি যৌথ অনুষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া এবং পূজার্চনা বিধির বিরুদ্ধে মুসলিম শিক্ষার্থীরা আপত্তি জানায়। এর প্রেক্ষিতে ফেব্রুয়ারির ২ তারিখ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনে (বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজের পুরাতন ভবন) ক্লাস চলাকালীন মুসলমান ছাত্রদের ওপর সাম্প্রদায়িক হিন্দু ছাত্ররা হামলা চালায়। ওই সময় সুপরিচিত মুসলিম ছাত্র নেতা শহীদ নজিরকে বেধড়ক পেটানোর পাশাপাশি উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করা হয়। সতীর্থরা তাকে মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি করলেও ক্ষতবিক্ষত শরীর থেকে রক্তক্ষরণ বন্ধ না হওয়ায় মাগরিবের সময় তিনি শাহাদাত বরণ করেন। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক পল্লীকবি জসীম উদ্দীন তার শিয়রে উপস্থিত ছিলেন। শাহাদাতের সময় ১৯৪৩ সালে তার এমএ পরীক্ষা দেয়ার কথা ছিল কিন্তু তার আগেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
শহীদ নজির ফেনীর আলিপুর গ্রামের একটি দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু সেই সময়েও দারিদ্র্যকে জয় করে তিনি পড়াশোনা করেন।
তিনি ১৯৩৭ সালে মাধ্যমিক পাস করার পর ১৯৩৯ সালে ফেনী কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে স্নাতক শ্রেণীতে ভর্তি হন। তিনি ১৯৪২ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে সম্মান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এমএ অধ্যয়নকালে তিনি শহাদাত বরণ করেন।
শহীদ নজির আহমদ সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্রনেতা ছিলেন। বাংলাদেশকে মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীন করতে পাকিস্তান আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি মুসলিম ছাত্র পরিষদের নেতা ছিলেন। তিনি অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক ও অধ্যাপক সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন সম্পাদিত পাক্ষিক ‘পাকিস্তান’ পত্রিকার ম্যানেজার ছিলেন।
১৯৪৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সাম্প্রাদায়িক ছাত্ররা শহীদ নজিরকে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসের জন্ম দিয়েছে। তবে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আয়োজনে সাধারণ হিন্দু ছাত্ররা মুসলিম ছাত্রদের সঙ্গে মিলে তার শাহাদাত বার্ষিকী পালন করে সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিল।
১৯৫২ সালে সংকীর্ণ বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান হয়। এরপর থেকে শহীদ নাজিরকে ভুলিয়ে দিতে থাকে ভাষা আন্দোলনকারীরা। শহীদ নাজিরকে চিহ্নিত করা হয় সাম্প্রদায়িক হিসাবে। জাতীয় অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান বলেন, ১৯৫২ সালের পর থেকে আর কখনো ঢাবিতে শহীদ নাজির দিবস পালন করা যায়নি। এর কয়েকবছর পর সবাই শহীদ নাজির কে ভুলে গেল। এমনকি তার নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন স্থাপনার নামকরণও করা হয়নি।
তবে ঢাকার নাজিরা বাজার এবং ফেনীর নাজির রোড এখনো শহীদ নাজিরের স্মৃতিকে আগলে রেখেছে। এখনই তার নামে রাষ্ট্রীয়ভাবে দিবস ঘোষণা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ও ফেনীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নামকরণ করে তার প্রতি জাতির শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিবেদন করা সময়ের দাবি।
লেখক: নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স এন্ড ডেভেলপমেন্ট – সিজিডি